বিটিআরসি’র অনুমতি ছাড়া ক্যাপিং বেআইনি, ক্যারিয়ার নিরপেক্ষতা ভূলুণ্ঠিত
লাইসেন্স নীতিমালায় ক্যারিয়ার নিরপেক্ষতার অভাবে দেশের ইন্টারনেট সেবায় পদে পদে বিপাকে পড়ছেন সেবাদাতারা। গত দেড় মাস ধরে লকডাউনে ঘরে বসেই গ্রাহকদের অফিস, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কেনাকাটার মতো মৌলিক ই-সেবা নিশ্চিত করতে গ্রাহক পর্যায়ে নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্পের প্রকৃত সুফল পৌঁছে দিয়েও তারাই এখন পড়েছে বিপাকে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ নামের এই প্রাণভোমরাকে সচল রাখতে গিয়ে তাদের এখন নাভিশ্বাস ওঠার যোগাড়।
জরুরী পরিস্থিতিতেও পাওনা আদায়ের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ব্যান্ডউইথ সরবরাহ পর্যায়ে পরোক্ষভাবে ন্যাশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) ব্যবহার করা হচ্ছে। একই ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকা আইআইজি, আইটিসি ও এনটিটিএন লাইসেন্স যেন বাজার শোষণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে কেবল মনোপলি ব্যবসাই নয়; লঙ্ঘিত হচ্ছে ভোক্তা অধিকার। কেননা, এসব প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সকে পেশী শক্তির মতো কাজে লাগিয়ে ঢালাও ভাবে পাওনা আদায়ের নামে ‘ব্যান্ডউইথ ক্যাপ’ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে নেটওয়ার্ক নিরাপেক্ষতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি নিয়ন্ত্রক সংস্থার অগোচরে লাইসেন্স ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়েও অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা।
নীতিমালার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ বাজারের ভারসাম্য নষ্ট করছে অভিযোগ করে এ বিষয়ে আইএসপিএবি মহাসচিব ইমদাদুল হক প্রশ্ন রাখেন, “দেশে ৬টি আইটিসি প্রতিষ্ঠান আছে। দুইটা আইটিসি ছাড়া কি কারো কোনো অস্তিত্ব আছে?”
তিনি বলেন, “ট্রান্সিমশন যার কাছে আছে সেই এখন কিং। অন্য দশজনকেও আইআইজি লাইসেন্স দেয়া হলেও লাভ হবে না। যার জন্য আমাদের এই পলিসির জায়গায় আমাদের হাত দিতে হবে। যার কাছে ট্রান্সিমিশন লাইসেন্স থাকবে সে শুধু ট্রান্সমিশন ব্যবসা করতে পারবে। তার আইআইজির মতো বাল্ক ব্যান্ডউইথ থাকার ক্ষমতা থাকা উচিত না। থাকলেই মার্কেট স্ট্যাবেল থাকবে না।”
বকেয়া পাওনা বিষয়ে কোনো ট্রান্সমিশন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের নালিশ থাকলে ঢালাও ভাবে না বলে নির্দিষ্ট বিষয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে আইএসপিবি’র কাছে কিংবা বিটিআরসি’র কাছে অভিযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি। তা না করে দেশে চলমান জরুরী লাকডাউন পরিস্থিতিতে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করাটা ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে অন্তরায় বলেও মন্তব্য করেন ইন্টারনেট সেবাদাতাদের এই নেতা।
চলমান লকডাউন সময়ে পাওনা আদায় কিংবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে আইটিসি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ দাখিল কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমতি নেয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে বিটিআরসি’র ইঅ্যান্ডআই বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক হাজ্জাজ হেলাল জানিয়েছেন, তিনি কোনো অভিযোগ পাননি। কেউ তাকে এ বিষয়ে অবহিত করেনি।
এমন পরিস্থিতিতে নীতিগত সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে কেউ বাজার ভারসাম্য নষ্ট করে থাকলে প্রয়োজনে নীতিমালা সংশোধন করা হবে বলে জানিয়েছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি চেয়ারম্যান মো: জহুরুল হক।
একই প্রতিষ্ঠানের কাছে ততোধিক লাইসেন্স থাকা বিষয়ে তিনি বলেন, “কোনো জিনিস বেশি বা মনোপলি হয়ে গেলে সমস্যা হয়। যখন এই লাইসেন্স দেয়া হয়েছে তখন কেউ ছিলো না। দিতে বাধ্য হয়েছে। এখন বিজনেসের সুযোগ বেশী আছে এখন দেয়ার সময় সেটা ভাবা হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান শুরুর আগে সব কিছু মানা যায় না। একসময় লোক খুঁজে পাওয়া যায় নাই। এটা হয়েছে ৫-১০ বছর আগে। তখন কোনো ব্যবসায়ী আসে নাই। বোঝেই নাই।”
লাইন ক্যাপিং বিষয়ে তিনি আরো বলেন, “যে কোনো অ্যাকশন নিতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। বিটিআরসির অনুমতি লাগবেই।”
কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থাহে অবগত না করে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানকে তোয়াক্কা না করেই কতিপয় প্রতিষ্ঠান করোনা পরিস্থিতিতেও বিল আদায়ে মরিয়া হয়ে সংযোগ সেবা বিচ্ছিন্ন করছেন বলে অভিযোগ গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়া সেবাদাতাদের। তারা বলছেন, এখন সবকিছু বন্ধ থাকায় ব্যাবহার বাড়লেও তাদের আয় কমেছে। বিল আদায় করতে পারছে না। ব্যাংকগুলো পর্যন্ত বকেয়া আদায়ে চাপ না দিলেও ডিজিটাল বাংলাদেশের ‘প্রাণবায়ু’ ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতেও কসুর করছেন না ততোধিক লাইসেন্সধারী ব্যান্ডইউথ ব্যবসায়ীরা।